শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
দরিদ্র্যতা কমাতে ধনীরা গরিবদের বিয়ে করুন: ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী  » «   তাহিরপুরে সংস্কার হচ্ছে না শহিদমিনার  » «   শাবিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও মহান শহিদ দিবস পালিত  » «   ৬৮ বছরেও হয়নি ভাষা সংগ্রামীদের তালিকা  » «   সুনামগঞ্জে প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন  » «   গোলাপগঞ্জে একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা  » «   গোয়াইনঘাটে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি  » «   সিলেট জেলা ছাত্রদলের ৫ সাংগঠনিক টিম গঠন  » «   শ্রদ্ধার ফুল হাতে সিলেট শহীদ মিনারে মানুষের ঢল  » «   প্রেমিকের সাথে হোটেলে প্রবাসীর স্ত্রী, জেল-জরিমানা  » «   এই প্রথম ইংল্যান্ড দলে একসাথে ৩ মুসলিম ক্রিকেটার  » «   আমি উধাও হইনি, দেশেই আছি : বুবলী  » «   জাতীয় দলে ডাক পেলেন মেহেরপুরের সোহাস  » «   প্রেমিকাকে ৮৭ লাখ টাকা হাতখরচ দেন রোনালদো  » «   শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন  » «  

দিনবদলের ছোঁয়ায় বেড়েছে গৃহকর্মী সংকট

ফাইল ছবি

মো. ওবায়দুর রহমান :গৃহস্থালির কাজের জন্য একজন বুয়া (ঝি) পাওয়ার তীব্র সংকট এখন। মোটামুটিভাবে স্বচ্ছল একটি পরিবার দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজের জন্য একজন বুয়া’র ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে থাকেন। ঐ পরিবারের গৃহকত্রী তার ছোট্ট সন্তানাদির প্রাথমিক পাঠদান, স্কুলের বইপত্র, টিফিন গুছিয়ে দিয়ে স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা ইত্যাদি সংসারের সকল সমস্যা ঘেটে রান্না করার কাজ তিনি নিজেই করে থাকেন। আর গৃহকত্রী চাকুরে হলে তো আরও সমস্যা। এ ক্ষেত্রে অনেক কিছুই ঐ মাসিক বেতনের বুয়াকেই করতে হয়।
এতদিন আমাদের সমাজ চলছিল এভাবেই। কিন্তু আজ যেন এটা নেই। প্রায় সব পরিবার এখন বুয়াবিহীন অবস্থায় আছেন এবং অতি সত্ত্বর আমাদের দেশ থেকে এ প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই কিছুদিন পূর্বে ঘরের কাজের জন্য একজন ঝি রাখার সময় ঐ মেয়ের সরবরাহকারী, পিতা-মাতা, ভাই-বোন শর্ত দিতেন যে, বুয়াকে টিভি দেখতে দিতে হবে কিংবা ভাল খাট পালংক দিতে হবে, মাসিক বেতন বাড়িয়ে দিতে হবে। মাস-দুই মাস একবার ছুটি দিতে হবে, পান সুপারী দিতে হবে ইত্যাদি। অনেক বাড়ির মালিক বেতনের বেলায় একটু দর কষাকষি করে অপরাপর শর্ত মেনে নিয়ে ঝি রেখে দিতেন। বিশ্বস্ততার একটা বিষয় খুব ভাল করে দেখতেন। কিন্তু হালে আর ঝি নিয়োগের সময় শর্ত তো দূরের কথা মাসিক ৫-৬ হাজার টাকা দিয়েও ঝি পাচ্ছেন না। একজন আজ রাখলেন তো কিছুদিন কাজ করে একটা বাহানা ধরে চলে যাচ্ছে। তখন বাধ্য হয়ে খন্ডকালীন ভিত্তিতে ‘ছুটা’ হিসেবে অর্থাৎ কাজের মেয়ে দৈনিক আসবে এবং কাজ করে চলে যাবে এরূপ মানুষও এখন পাওয়া কঠিন। তাও কাজ নেওয়ার সময় কি কি কাজ সে করবে তা নির্ধারণ করে দিয়েও ঝি পাবেন না। এ সংকটে দিশেহারা এখন সবাই। উন্নত দেশ সমূহে যেমন নিজে নিজের কাজ করতে হয় তেমন একটি অবস্থায় কি আমরা চলে এসেছি? সবকিছু মিলিয়ে এ প্রশ্নের উত্তরের একটা সমীকরণ করলে যা দাঁড়ায় তা হলো ঃ
না। আমাদের স্বচ্ছলতা দারিদ্র পর্যায় থেকে বের হচ্ছে এটা ঠিক। তবে তা এমন পর্যায়ে উপনীত হয়নি যে দেশের দরিদ্র শ্রেণীর প্রত্যাশা বিশাল হবে। আর হতদরিদ্র শ্রেণীর মানুষের উত্তরণ হলেও নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর হালহকিকত পূর্ববৎ রয়েছে। তারা না পারছে নিচে নামতে না উপরে উঠতে। তবে কেন দেশের এই দরিদ্র শ্রেণীর আজ এতো ডিমান্ড।
কারণগুলো খতিয়ে দেখলে উহার প্রথম ও প্রধান কারণ হিসেবে এটা সত্য যে, দেশের বড় বড় শহরগুলিতে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, মিল কারখানা, প্রাইভেট ক্লিনিক, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, পোল্ট্রি, ফিসারিজ ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। তাছাড়া উচ্চবিত্ত মানুষের জীবনমান উন্নত হওয়ার কারণে বড় বড় বিল্ডিং-টাওয়ার নির্মিত হচ্ছে। এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অনেক পদে চাকরি-কাজ করতে লেখাপড়ার প্রয়োজন পড়ে না এবং মাসিক বেতন ও বাসার কাজের বেতনের চেয়ে অনেক বেশি দেওয়া হয়। তাছাড় ঐ গুলিতে কাজের একটি সময়সীমা থাকে ও চাকরির নিশ্চয়তা থাকে বিধায় ইতোমধ্যে বহুসংখ্যক মহিলা-পুরুষ ঐ সমস্ত কাজে নিয়োজিত হয়েছে। প্রাইভেট কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বৃদ্ধির কারণে দেশে শিক্ষার প্রসার হচ্ছে এবং ঐ সমস্ত শিক্ষাঙ্গনে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী মেস করে বসবাস করে। তাই এই সমস্ত কাজের মহিলারা বাসাবাড়িতে কাজ করে মাসে যে বেতন পাবে একটি মেসে কাজ করলে তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা প্রতি মাসে পাচ্ছে। তাছাড়া তারা দিনে একটি নির্দিষ্ট কাজে ব্যস্ত থাকে না। একাধিক কাজকর্ম করে মাস প্রতি দশ-বিশ হাজার টাকা পাচ্ছে। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মৌসুমে ফলমূলের পাশাপাশি হাইব্রীড ফলমূল-শাকসবজি বৎসরের সকল সময় উৎপাদন হচ্ছে। তাতে করে দরিদ্র শ্রেণীর পুরুষ সদস্যগণ কোন রকমে ভার বহন করে কিংবা ঠেলাগাড়ি দিয়ে এ সমস্ত কাঁচামাল বিক্রি করে ভাল আয় উপার্জন করতে সক্ষম। সুতরাং তাদের স্ত্রী, মেয়েরা বাসা বাড়ির নির্ধারিত কম টাকায় কাজ করতে অনীহা দেখাচ্ছে। তাছাড়া লাখো লাখো সিএনজি অটোরিক্সা তো আছেই। দ্বিতীয়ত ভিক্ষাবৃত্তি দেশে এখন একটি অত্যন্ত লাভজনক পেশা। দেশে ১০ ঢাকার চেয়ে ছোটনোট নেই বললেই চলে। ভিখারীকে এখন ঐ নোটটি দিতে হয়। একটি দরিদ্র পরিবারের ৪-৫ জন সদস্য একটু ভণিতা করে হাত পাতলে তাই প্রচুর টাকা প্রতিদিন পেয়ে যাচ্ছে। এই ভিখারীগণ এত বেশি কৌশলী ও বুদ্ধিমান যে তাদের ভিক্ষা পাওয়ার স্থান তারা বেছে নেয় পেট্রোল পাম্পে। দেশের মানুষের জীবনমান উন্নত হওয়ায় প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। আপনি সপরিবারে কিংবা একা গাড়ি নিয়ে কোথাও যাবার প্রাক্কালে জ্বালানী নেওয়ার জন্য ফিলিং স্টেশনে থামার সাথে সাথে দেখবেন এক ঝাঁক ভিখারী আপনার গাড়ি ঘেরাও করে আছে। কারণটা সাইকোলজিক্যাল। যাত্রাপথে দুর্ঘটনার ভয় একটা থাকে বিধায় তারা আপনার মনের ঐ কম্পন বুঝতে পারে। এ জন্য এ স্থান বেছে নেওয়া। আদালতে ঠিক যে কামরায় ক্রিমিনাল কেইস পরিচালিত হয় সেখানে আসামী পক্ষের লোকজন তাদের স্বজনদের জামিন খালাসের জন্য উকিল সাবদের মাধ্যমে আবেদন করে শুনানী করাকালীন দেখা যায় বারান্দার সিঁড়ির পাশে ভিখারীদের টাকা চাওয়ার আকুল আকুতি। তারা বিয়ের গাড়িতে ধাওয়া করবে। এটার কারণ নবদম্পতির সুখ-শান্তি তো আপনি চান। কিছু দিবেন তা তারা জানে। মৃত ব্যক্তির বাড়ি যাবে। মসজিদের দরজার পাশে হাত পাতবে কারণ নামাজ আদায় করে মানুষ, এক কোমল মন নিয়ে মসজিদ হতে বের হয়ে। ট্রেন-বাসে উঠার সময় হাত পাতবে। হাসপাতালের সম্মুখে তারা সরব।
তৃতীয় কারণ হলো দেশে মাদক ব্যবসা এখন জমজমাট। গাঁজা, হিরোইন, ইয়াবা ইত্যাদি মাদকদ্রব্য বেচাকেনার পুরুষ অপরাধীর চেয়ে মহিলারা বেশি সক্রিয়। বিস্তর মামলা মোকদ্দমা এদের বিরুদ্ধে হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু এরা বদলায়নি। এদের একটি অংশ বেশ বড় অংকের টাকা রোজগার করে থাকে। মাদকের স্পট কোনটি তা তারা জানে। তাছাড়া নৈতিক অবক্ষয় তো আছেই। সুতরাং কাজ করে জীবিকা নির্বাহের চেয়ে তাদের নিকট এটা উত্তম ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। চতুর্থ কারণ সাম্প্রতিককালে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসমূহে এদেশীয় দালালদের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশের মহিলা ঐ সমস্ত দেশে চলে যাচ্ছে। তাদের স্বামী সন্তানগণ দেশে ভাল কাপড়চোপড় পরিধান করে গল্পগুজব করে আড্ডা দিয়ে ঐ সমস্ত মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তাদের মহিলা স্বজনদের টাকায় বেশ স্বচ্ছল জীবনযাপন করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যেতে তাদের কোন টাকা-পয়সা লাগে না। কালেভদ্রে কিছু দালাল জনপ্রতি ১০/২০ হাজার টাকা নেয়। এরূপ হাজার হাজার মহিলা এখন সৌদী আরব, কাতার, বাহরাইন, দুবাই প্রবাসী। তারা কি কাজ করে তা আমাদের জানা নেই। তবে ভাল নেই এ কথা জানা যায়। মরণব্যধি এইডস্ আক্রান্ত অনেক আছেন। সাম্প্রতিককালে এ সমস্ত বিদেশ ফেরত মহিলাদের করা মানবপাচার মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতদসত্ত্বেও অপরিণামদর্শী এ সমস্ত মহিলারা যেখানে ঐ সমস্ত দেশে ৬০/৭০ হাজার টাকা বেতনে যাচ্ছে সেখানে আপনার বাড়িতে ঝি হিসেবে সামান্য বেতনে কাজ করার কোন হেতু নেই। এই হলো সংক্ষেপে বাংলাদেশে এখন কাজের ঝি না পাওয়ার কারণ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশে নিম্নবিত্তের উন্নতি হচ্ছে। তারা মধ্যবিত্তে পদার্পণ করেছে। এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাদের সীমিত রোজগারের টাকা দিয়ে কাজের লোক রাখতে অপারগ। আমার মনে হয় সেদিন খুব দূরে নয়-যদি সার্বিক বিষয় মাথায় নিয়ে কোন পরিবারের ঐ সমস্ত আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকে তবে তাকে পনোর-বিশ হাজার টাকা মাসিক প্রদান করে কাজের বুয়া নিয়োগ করতে বাধ্য হতে পারে। পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া লাগতে পারে এবং বুয়া না বলে তাদেরকে গভর্নেন্স পদবী দিলে মানাবে। আর যাদের পক্ষে তা সম্ভব না, হয় তারা নিজেরা নিজ নিজ কাজ করতে হবে। বিলম্ব না করে গৃহস্থালি কাজের ট্রেনিং শুরু করার প্রয়োজন। তবেই হবে এই কাজের বুয়া খোঁজার এক যন্ত্রণাদায়ক পীড়া হতে পরিত্রাণ ।
লেখক : আইনজীবী

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে(লাইনে) ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

(আমার বাংলাদেশ/আরক/এ/ম )

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করবেন

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: -