মঙ্গলবার, ২০ অগাস্ট ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম
কুলাউড়ায় ট্রাক-সিএনজি সংঘর্ষে স্বামী-স্ত্রী গুরুতর আহত  » «   বার্সা ফরোয়ার্ড নেইমারকে কিনতে চায় জুভেন্টাস!  » «   ঘুরতে গিয়ে মোটর সাইকেল থেকে পড়ে লাশ হলো প্রেমিকা  » «   জগন্নাথপুর পৌর শহর যানজট মুক্ত অভিযান  » «   জগন্নাথপুরে অগ্নিকান্ডে ব্যাপক ক্ষতি  » «   জগন্নাথপুরে নৌকা বাইচ দেখতে হাজারো জনতার ঢল  » «   ছাতকের হাওর ও পুকুরে ২শ ৯৫ কেজি পোনা মাছ অবমুক্ত  » «   ঝিংগাবাড়ি সমাজ কল্যান সমিতির আনন্দ ভ্রমণ  » «   আর্থিক খাতের দৈনদশায় পূবালী ব্যাংক ব্যতিক্রম : ভিসি প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন আহমদ  » «   ছাতকে রাব্বি হত্যাকান্ড : কাউন্সিলর লিয়াকতসহ ৬জনের আগাম জামিন  » «   বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হত্যা করতে পারেনি খুনিরা: শামীম  » «   ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে আফগানিস্তান দল ঘোষণা  » «   ‘দেশ বিরোধী’ তকমা পেলেন সোনম!  » «   কানাডা থেকে দেশে ফিরেই মেহেরুন গ্রেপ্তার  » «   বিশ্বনাথে বিয়ের প্রলোভনে তরুণী ধর্ষিত  » «  

অকালে ঝরে গেল শিপলু

মো. ফয়ছল হোসেন :নিয়তি বড়ই নিষ্ঠুর। গত ৮ জুন শনিবার কি ভেবেছিলাম আজ এই শিরোনামে শিপুলকে নিয়ে আমাকে কিছু লিখতে হবে? শিপলুকে নিয়ে লেখাটি যে এভাবে কোনদিন লিখতে হবে, স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। আজ শিপলুর ঠাঁই হয়েছে স্মৃতির পাতায়, এটা ভাবতেই বুকের ভিতরে প্রচন্ড এক বেদনা অনুভব করছি। তার স্বাভাবিক মৃত্যু হলে যতটুকু কষ্ট পেতাম তার চেয়ে এই কষ্ট হাজার গুণ বেশি। শিপলু হঠাৎ করেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলো না ফেরার দেশে। শিপলু ছিল আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। সেই ছোটবেলা থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। ছোটবেলার যে কয়েকজন বন্ধুর কথা আমার মনে আছে, তার মধ্যে সে ছিল অন্যতম। তার প্রথম স্কুল ছিল কিশোরীমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওখানে ১ম ও ২য় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। এরপর শিপলু চলে যায় পাইলট স্কুলে। এর পর কলেজে। কলেজ শেষ করে সে চলে যায় সৌদিআরব। সেখানে অনেক দিন বসবাস করে। তার পর দেশে এসে নিজে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে। স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে তার ছিল একটি সুখের সংসার। এরপরই অকালে ঝরে গেল শিপলু।
হযরত শাহজালাল (র.) দরগাহ গোরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলো সিলেট নগরীর রাজারগলি আবাসিক এলাকার ১৯নং বাসার এই বাসিন্দা। সাবেক কমিশনার মো. আব্দুল গফ্ফার দিলীপের ছেলে ইফতেখার আলম ফরহাদ (শিপলু)। চারদিকে শোকাতুর মানুষের ভীড়ে প্রিয় মানুষ শিপলুকে চিরবিদায় জানাতে স্বজন-শুভাকাক্সিক্ষ-ভক্তসহ সবার চোখ ছিল অশ্রুসজল। এমনি মর্মস্পর্শী আবেগঘন পরিবেশের মধ্যে তাকে কবরস্থানে শীতল ছায়ায় মাটির ঘরে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। বিপুল সংখ্যক মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও চোখের জলে তাকে খুব যতনে শুইয়ে দেয়া হয় মাটির ঘরে। অচিন দেশে, অচিন কোনো জায়গায় চিরদিনের জন্য সে চলে গেল মহান প্রভুর কাছে। ১০ অক্টোবর ১৯৮০ইং তার জন্ম। ডাক নাম শিপলু। এতো অল্প আয়ু নিয়ে এই পৃথিবীতে এসেছিল সে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৩৯ বছর। আহারে কি সুন্দর একটা মানুষ! ওর এমন অকাল মৃত্যু হবে কেন? বন্ধু তুমি বা আমি কেউ কি জানি কখন আমাদের মৃত্যু হবে। জানিনা, পৃথিবীর কেঊ জানে না কখন তার মৃত্যু হবে। নিশ্চিত মৃত্যুর পৃথিবীতে কিছু কিছু মৃত্যু বড় বেশি ছাপ ফেলে যায়। মানুষের হৃদয়ে দাগ রেখে যায়।
৮ জুন ২০১৯ইং বিকেল সাড়ে চারটায় নিজ বাসার ছাদ থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে গুরুতর আহত হয় সে। আহত অবস্থায় ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। মাঝে মাঝে আমরা তার চোখের মণির নড়াচড়া দেখতে পেয়েছি, বুঝেছি সে আছে, কিন্তু তার শারীরিক অসাড়তা আমায় বলে দিয়েছে সে একা হতে চলেছে। তার সঙ্গে আমরাও। তারপর সে সত্যিই চলে গেল। আমরা তাকে ধরে রাখতে চেষ্টার বিন্দুমাত্র ত্রুটি করিনি। সবাই কেন তাকে ফেরাতে চেষ্টা করেছিলাম? সে বেঁচে থাকবে, সে জন্য? নাকি সে ছাড়া আমরা একা হয়ে যাব, সে কারণে? আদতে কি হলো? সেও একা হলো, তাকে হারিয়ে আমরাও একা হয়ে গেলাম। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুঠাম দেহের অধিকারী শিপলু রাত ৯ টায় ইন্তেকাল করে (ইন্না…রাজিউন)।
মৃত্যুকালে বাবা-মা, স্ত্রী, ৩ ছেলেসহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছে সে। তার বড় ছেলে সাজিদ তৃতীয় শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। সাজিদ সারাদিন ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বাবার জন্য অপেক্ষা করছে। সে বারবার একটি কথাই বলছে আমার আব্বা কেনে ছাদ থেকে পরে গিয়ে মারা গেলা। হায়রে নিয়তি তুমি কার ভাগ্যে কি রেখেছো একমাত্র তুমিই তা জানো। ছোট যমজ দুটি ছেলের বয়স মাত্র আড়াই বছর। বাবাকে হারিয়ে ছেলেরা অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। কয়েক দিন আগে তার আড়াই বছর বয়সী শিশু পুত্রের হার্টে অপারেশন করিয়েছে ঢাকার ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটালে। তার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে পুত্রের হার্টে ছিদ্র ধরা পড়ায় দ্রুত অপারেশন করাতে হয়। ঈদের কয়েকদিন আগেই পুত্রের হার্টের ছিদ্র অপারেশন শেষ করে বাসা আসে। শিপলুর আম্মা ছিলেন শিক্ষিকা। তার স্ত্রীও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।
শিপলুর চলে যাওয়া আমার জন্য আরেকবার একা হয়ে যাওয়ার ঘটনা। সে আমার খুবই ভালো বন্ধু ছিলো। তার সঙ্গে জীবন-সংসার নিয়ে খোলা মনে যে আলোচনাগুলো আমি করতাম, তা আর কারও সঙ্গে হতো না। তার চলে যাওয়ার কয়েক দিন হয়ে গেল। আমি এখনও স্বার্থপরের মতো ভাবছি সে আমায় একা করে চলে গেছে। বন্ধুর এমন করুণ মৃত্যু মানা যায় না। এ নিয়ে একই এলাকার তিন তিনটি বন্ধু হারালাম। কয়েকদিনের ব্যবধানে আমার ছোটবেলার ৩ বন্ধু চলে গেল না ফেরার দেশে। বাল্যকাল থেকে একে অন্যের প্রাণের বন্ধু। ছোটবেলা থেকে আমাদের এক সাথে বেড়ে উঠা। ২০০৯ সালের ১১ নভেম্বর সালে মারা যায় সৈয়দ সুমন আহমদ, ১০৩ রাজারগলির বাসিন্দা। ২৩ অক্টোবর রোববার ২০১৬ মারা যায় মো. মঈনুল হোসেন (সুমন), ২৭ রাজারগলির বাসিন্দা আর গত ৮ জুন শনিবার ২০১৯ ইফতেখার আলম ফরহাদ (শিপলু), ১৯ রাজারগলির বাসিন্দা। সে বাসার ছাদ থেকে পরে ইন্তেকাল করে। আমার প্রিয় তিন বন্ধুই শাহজালাল (রহ.) মাজার সংলগ্ন দরগাহ গোরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত।
মৃত্যু মানে কেবলই একটা জীবনের ইতি, একটা শরীরের পরিসমাপ্তি। মুহূর্তের মধ্যে খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরলে তার বন্ধু-বন্ধব, আত্মীয়-স্বজন হাসপাতালে ও তার বাসায় ভিড় করেন। বাসায় ফিরেছিল তার প্রাণহীন দেহ। না চাইলেও তার দেহকে বিদায় দিতে হয়েছে। জানাজায় তার বন্ধু, আত্মীয় স্বজন, রাজনীতিক, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের বিপুল সংখ্যক লোক উপস্থিত ছিলেন। তার জানাজায় সকল শ্রেণীর লোকের উপস্থিতি এবং যে আবেগ প্রকাশিত হয়েছে তাতেই বুঝা যায় সে সকল স্তরের মানুষের কাছে কতটুকু স্থান করতে পেরেছিলো। এলাকায় কারও সাথে কোন দিন উচ্চবাক্য বিনিময় করেছে কেউ বলতে পারেননি। তাই তো স্বজনহারা এলাকাবাসীর কান্না আর আহাজারীতে এলাকায় হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়, আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এলাকায়। যে এলাকায় সে হেঁটে খেলে বড় হয়েছেন। এখানকার মানুষের সাথে তার নাড়ির সম্পর্ক। তার অকাল মৃত্যুর খবর যেন কারও বিশ্বাস হচ্ছিল না। অগণিত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজন আজ তাকে হারানোর শোকে মুহ্যমান। সে তার কর্মের মাঝে সমুজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় আপন মহিমায় বেঁচে থাকবে। অতি আপনজনের অকাল মৃত্যু ভেঙে চুরমার করে দেয় হৃদয়-মন। তার বাবা-মা, পরিবারের সদস্যরা তো বটেই; শিপলুর অকাল মৃত্যুতে পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ। তবে আমার হৃদয়ে রক্তরক্ষণ একটু বেশিই হচ্ছে। প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা।
মৃত্যুর ৩দিন আগে ঈদের দিন আমাদের সবার সাথে শিপলু অনেক ছবি তুলেছে। খুব মজা করেছে। বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়গুলার সাথে অন্য কোন সময়ের তুলনা দেওয়া চলে না। কারোর কোন ভালো খবরে একসাথে আনন্দ করা চাই। কারোর কোন খারাপ সময়ে একসাথে তার পাশে থাকা চাই। মোট কথা, রক্তের সম্পর্কের বাইরের যে সম্পর্কটাকে কোনকিছু বলে বা কোন সংজ্ঞা দিয়ে বোঝানো যায় না, সেই সম্পর্কটাই বন্ধুত্ব!
‘বন্ধুত্ব’ হতে পারে খুব ছোট্ট একটা শব্দ। কিন্তু তার গভীরতা এবং তার ভেতর লুকিয়ে থাকা স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা এবং সম্পর্কের দৃঢ়তা থাকে অনেক বেশি। অন্য যে কোন সম্পর্ক থেকে ‘বন্ধুত্বে’র সম্পর্ক সম্পূর্ণ আলাদা। বন্ধুত্ব পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ‘বন্ধুত্ব’ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপহারের মধ্যে একটি। রক্তের সম্পর্ক ছাড়া যদি আর কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে থাকে, তাহলে সেটা হলো বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব হলো মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, আত্মার শক্তিশালী বন্ধন। বন্ধুত্বের কারণে মানুষ সুখী হয়। ভালো বন্ধু কখনোই একে অপরকে ভুলে যাবে না বরং আরো বেশি করে একে অপরকে মনে করবে এবং সময় পেলেই একে অপরের সাথে দেখা করে খুনসুটি করবে এটিই বন্ধুত্বের রূপ।
শিপলুর সাথে দিনে অন্তত একবার না একবার দেখা হতো কারণ তার বাসার সামনে দিয়ে যেতাম সবসময়। রাস্তার পাশেই ছিল তার বাসা। তার বাসা ছিল দু’তলা। দু’তলার ছাদে সবসময় তাকে দেখা যেত কারণ সে ওখানে গাছের বাগান, ফুলের বাগান বানিয়ে ছিল। আর এগুলোকে দিন-রাত সবসময় দেখাশুনা করতো। অনেক সময় রাত ১২টার পরেও দেখা যেত সে গাছে পানি দিচ্ছে। সে যেদিন মারা যায় ঐদিন আছরের সময় সে নতুন একটি ফুলগাছ টবে লাগাতে দ্বিতীয় তালার ছাদে উঠেছিল। টব নিয়ে সে যখন ছাদের ঠিক শেষ মাথায় যায় তখনি সে পা স্লিপ করে নিচে পাকাতে পরে মাথায় ও হাতে গুরুত্বর আঘাতে আহত হয়। সে ছিল অন্যান্য বন্ধুদের থেকে আলাদা, আর যখনই কারো সাথে দেখা হতো কোনদিনও কাউকে নাম ধরে ডাকতো না। দেখা হলেই ও আগবাড়িয়ে বলতো ভাই ভালানি, এখনও কানে লেগে আছে। আমি যে তার ছোটবেলার বন্ধু ছিলাম আমাকেও সে নাম ধরে ডাকতো না। কেন জানি তার কথা ভুলতে পারছি না। মনে কষ্ট লাগছে খুব, বিশেষ করে তার সাথে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে হলে আরো কষ্ট লাগছে।
লেখক : দৈনিক সিলেটের ডাক-এর ডিজাইনার ও কলামিস্ট।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে(লাইনে) ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

(আমার বাংলাদেশ/ আর : আহমেদ)

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করবেন

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by: -